শরিয়ত, তরিকত, মারেফত ও হাকিকত বিতর্কের সমাধান!
একটা প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি। আপনি কি কখনো এমন মানুষ দেখেছেন যে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, রোজা রাখে, হজও করেছে, কিন্তু তার চরিত্রে এর কোনো প্রতিফলন নেই? কোনো কোনো ক্ষেত্রে উল্টা তার মধ্যে অহংকার, হিংসা আছে, রিয়া অর্থাৎ লোক দেখানো ইবাদত এসবেরই উপস্থিতি বুঝতে পারা যায়!
এই বাস্তবতা দেখেই একসময় কিছু মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে বলেছিলেন শুধু বাইরের আমল দিয়ে হবে না, নিজেদের ভেতরটাও তো ঠিক করতে হবে। তো এই উদ্বেগটা আসলে সঠিকই ছিল। এই উদ্বেগ থেকেই ইসলামের ইতিহাসে তাসাওয়ুফ নামে একটি চর্চার জন্ম হয়েছিল।
কিন্তু সেই সঠিক উদ্বেগ থেকে শুরু হওয়া পথটা পরে কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে, সেটা নিয়ে আজ কথা বলতে চাই। কারণ বাংলাদেশসহ পুরো উপমহাদেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ এই বিষয়টা নিয়ে এমন এক ধোঁয়াশার মধ্যে আছেন যে তারা বুঝতেই পারছেন না কোথায় দ্বীন আর কোথায় বিচ্যুতি।
শরিয়ত, তরিকত, মারেফত, হাকিকত।
এই চারটা স্তর কোথা থেকে এলো? এই চারটা শব্দ আজকাল অনেক জায়গায় শোনা যায়। বলা হয় এগুলো দ্বীনের চারটা স্তর। শরিয়ত হলো বাইরের আমল, নামাজ রোজা হজ যাকাত। তরিকত হলো সেই আমলের ভেতরের পথ, আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার পদ্ধতি। মারেফত হলো আল্লাহকে চেনার গভীর জ্ঞান। আর হাকিকত হলো সেই চেনার চূড়ান্ত বাস্তবতা যেখানে পৌঁছানো সবার জন্য সম্ভব না।
এই কাঠামোটা শুনতে কিন্তু বেশ গভীরই মনে হয়। এখন একটা প্রশ্ন হলো এই কাঠামো কি কুরআন ও সহিহ হাদিস থেকে এসেছে? সত্যি কথা হলো, এই চারটা স্তর এমনভাবে কুরআনের কোথাও উল্লেখ নেই, সহিহ হাদিসেও নেই, সাহাবায়ে কেরামদের আমলেও এইভাবে ছিল না। ইসলামের প্রথম তিন শতাব্দীতে, যেই যুগকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে সর্বোত্তম যুগ বলে ঘোষণা করেছেন, সেই যুগেও এই কাঠামো ছিল না।
কুরআনে অন্তরের পরিশুদ্ধির কথা আছে। তাযকিয়াতুন নাফসের কথা আছে। আল্লাহকে ভয় করার কথা আছে। আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণের কথা আছে। এই জিনিসগুলো ইসলামের মূল অংশ।
কিন্তু এগুলো পেতে একটা বিশেষ সিলসিলার পীরের হাত ধরতে হবে, ওই চারটা পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে এই ধারণা কোথাও ছিল না। এটা পরে তৈরি হয়েছে। মোটামুটি দ্বিতীয় ও তৃতীয় হিজরি শতাব্দী থেকে তাসাওয়ুফ একটি আলাদা শাখা হিসেবে দাঁড়াতে শুরু করে। শুরুতে হাসান আল বাসরি রহিমাহুল্লাহর মতো মানুষরা দুনিয়ার প্রতি বিরাগ এবং আখেরাতমুখিতার কথা বলেছিলেন, তবে এটা ছিল সম্পূর্ণ সহিহ। কিন্তু ধীরে ধীরে এই ধারায় এমন কিছু ধারণা এবং চর্চা ঢুকতে শুরু করল যেগুলো মূল ইসলামের সাথে মেলে না।
ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামর প্রচার প্রসারে সুফি দরবেশদের ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই। তারা এই মাটিতে এসেছিলেন ইসলামের আলো নিয়ে, এবং তাদের চরিত্র ও আচরণের মাধ্যমে অনেক মানুষ ইসলামের দিকে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। কিন্তু সমস্যা হলো এই মাটির বহু পুরনো সংস্কৃতির প্রভাব। হিন্দু দর্শনে গুরু শিষ্যের যে সম্পর্ক, অবতারের যে ধারণা, মৃত সাধকদের স্থানকে তীর্থস্থান হিসেবে দেখার যে রীতি, এগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই মাটিতে গেঁথে ছিল। আর ইসলাম যখন এখানে এলো, তখন সেই সংস্কৃতির সাথে মিশে যাওয়া শুরু হলো।
কেউ সচেতনভাবে এগুলো মেশাননি। কিন্তু পরিবেশের প্রভাব এমনভাবে কাজ করে যে মানুষ টেরই পায় না কখন তার বিশ্বাসের ভেতরে ভিনদেশী ধারণা ঢুকে যায়। হিন্দু অবতারবাদের ধারণা পীরের মধ্যে ঢুকে গেল। তান্ত্রিকদের ধ্যানের রীতি মিলে গেল মুরাকাবার সাথে। তারপর মৃত সাধকদের কবর হয়ে গেলো মাজার, আর সেই মাজার হয়ে গেলো তীর্থস্থান (আসতাগফিরুল্লাহ)।
চিশতিয়া, কাদেরিয়া, নকশবন্দিয়া, সুহরাওয়ার্দিয়া। এই সিলসিলাগুলো প্রথমে যাদের নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তারা ছিলেন বড় আলেম, অনেক ক্ষেত্রে মুত্তাকি মানুষ।
কিন্তু প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়ে এর মূল শিক্ষা অনেকাংশে হারিয়ে গেছে, আর খোলসটা শুধু থেকে গেছে। আর সেই খোলসের মধ্যে এখন অনেক জায়গায় যা চলছে সেটা নিয়ে সরাসরি কথা বলা দরকার। পীর সাহেবের হাত ধরলে নাজাত হবে। পীর সাহেবের কাছে থেকে রুহানি শক্তি পাওয়া যায়। পীর সাহেব গায়েব জানে বা জানার ক্ষমতা রাখে। মৃত পীরের রুহ এখনো মুরিদের খবর রাখছে। মাজারে গিয়ে কিছু চাইলে তা পাওয়া যায় ও মুশকিল আসান হয়। পীর সাহেবকে না মানলে আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছানো যায় না। আসতাগফিরুল্লাহ!
এই কথাগুলো বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে তো শোনা যায়ই। শহরের বহু শিক্ষিত মানুষের মুখেও শোনা যায়। এগুলো এত স্বাভাবিকভাবে বলা হয় যে অনেকে একবারও ভেবেই দেখেন না যে, এই বিশ্বাসগুলো ইসলামের কোথায় আছে।
আসেন একটু দেখি। পীরের হাত ধরলে নাজাত হবে। নাজাত দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ। কুরআনে আল্লাহ বলছেন, "প্রত্যেক আত্মা তার নিজের কৃতকর্মের বিনিময়ে জামিনস্বরূপ আটক থাকবে।" (সূরা আল মুদ্দাসসির, ৭৪:৩৮)
কোনো মানুষ, সে যত বড় সাধকই হোন না কেন, অন্যের নাজাতের কারণ হতে পারবে না। কিয়ামতের দিন কেউ কারো বোঝা বহন করবে না, এটা কুরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণা। (সূরা ফাতির, ৩৫:১৮)
পীর নাকি গায়েব জানে। আল্লাহ কুরআনে পাঁচটি বিষয়কে একমাত্র তাঁর নিজের জ্ঞানে সীমাবদ্ধ বলেছেন। কেয়ামতের সময়, বৃষ্টির খবর, গর্ভের বিষয়, আগামীকাল কি হবে, কোথায় মৃত্যু হবে। সূরা লুকমানের শেষ আয়াতে এটা স্পষ্ট। (সূরা লুকমান, ৩১:৩৪)
কোনো পীরের এই জ্ঞান রাখার ক্ষমতা নাই। যদি কেউ এমন দাবি করে, তাহলে সেই দাবি মিথ্যা অথবা শয়তান জিনের সাহায্যে ঘটা কোনো বিভ্রান্তি।
মৃত পীরের রুহ সব নাকি দেখছে, মুরিদদের খেয়াল রাখছে। মৃত্যুর পরে দুনিয়ার সাথে মানুষের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায় তিনটি বিষয় ছাড়া। সদকায়ে জারিয়া, উপকারী ইলম এবং নেক সন্তানের দুআ। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৬৩১)
এর মানে মৃত মানুষ দুনিয়ায় আর কোনো সক্রিয় ভূমিকাই রাখতে পারে না। মাজারে গিয়ে চাইলে মুশকিল আসান হয়। মৃত মানুষের কাছে সরাসরি সাহায্য চাওয়াকে আরবিতে ইস্তিগাসাহ বলা হয়। বড় আলেমদের বিশাল একটি অংশ এটাকে শিরকে আকবার বা বড় শিরক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কারণ এখানে সাহায্য চাওয়া হচ্ছে এমন কারো কাছে যিনি শুনতে পান না, দেখতে পান না, এবং সাহায্য করার কোনো ক্ষমতাও রাখেন না।
আর এটা ঠিক সেই কাজ যেটা মক্কার মুশরিকরা মূর্তির ক্ষেত্রে করত। এবার উসিলার বিষয়টা নিয়ে একটু আলাদাভাবে বলা দরকার। কারণ এই জায়গায় অনেকেই সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্ত হয়। তারা বলে আমরা তো পীরকে ইলাহ মানি না, আমরা শুধু তাকে উসিলা মানি। যেভাবে এক বন্ধু আরেক বন্ধুর কাছে সুপারিশ করতে পারে, সেভাবে পীর আল্লাহর কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করবে (আসতাগফিরুল্লাহ)।
এই যুক্তিটা শুনতে একদম নিরীহ মনে হয়। কিন্তু হুবহু এই যুক্তিটাই দিয়েছিল মক্কার মুশরিকরা। আল্লাহ সূরা যুমারে তাদের কথা উদ্ধৃত করেছেন। তারা বলেছিল আমরা এগুলোর ইবাদত শুধু এজন্যই করি যাতে এগুলো আমাদের আল্লাহর আরও নিকটবর্তী করে দেয়। (সূরা আয যুমার, ৩৯:৩)
আর আল্লাহ এই যুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং এটাকে শিরক বলেছেন। উসিলার ধারণা ইসলামে আছে, কিন্তু সেই উসিলা হলো নেক আমল, ঈমান, দুআ এবং আল্লাহর নাম ও গুণাবলি। আবার, কোনো জীবিত মানুষের কাছে তার উপস্থিতিতে দুআ চাওয়া এক কথা, আর মৃত মানুষকে মাধ্যম বানিয়ে তার কাছে সরাসরি সাহায্য চাওয়া সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
এবার তাসাওয়ুফের বৈধ অংশ নিয়ে একটু কথা বলি। এখানে একটা সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো। তাসাওয়ুফের মধ্যে যা ঢুকেছে তার সবই বাতিল না।
ইমাম গাজ্জালি রহিমাহুল্লাহ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ এহইয়াউ উলুমুদ্দিনে অন্তরের রোগগুলো নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। অহংকার কী, কৃপণতা কী, হিংসা কী, রিয়া কী, এগুলো কীভাবে তৈরি হয় এবং কীভাবে সারানো যায়। আর এই আলোচনার মূল ভিত্তি কুরআন ও হাদিস। ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ তাঁর মাদারিজুস সালিকিনে একই বিষয় আরো গভীরভাবে কুরআনের আলোকে বিশ্লেষণ করেছেন।
ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ রহিমাহুল্লাহ, যিনি তাসাওয়ুফের বিচ্যুতিগুলোর সবচেয়ে তীব্র সমালোচক ছিলেন, তিনিও স্বীকার করেছেন যে অন্তরের পরিশুদ্ধির ইলম ইসলামের একটি অপরিহার্য অংশ। তাঁর আপত্তি ছিল সেই চর্চার মধ্যে ঢুকে যাওয়া শিরকিয়া ধারণাগুলোর বিরুদ্ধে, তবে আত্মার পরিশুদ্ধির মূল ধারণার বিরুদ্ধে না। এই জ্ঞানকে ইলমুত তাযকিয়াহ বা ইলমুল আখলাক বলা হয়। এটা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয় অধ্যায়।
কিন্তু সমস্যাটা তখনই হয় যখন এই জ্ঞানকে একটি গোপন বিদ্যার মতো উপস্থাপন করা হয়, যেটা কেবল কোনো নির্দিষ্ট সিলসিলার পীরের কাছ থেকে পাওয়া সম্ভব। যখন বলা হয় শরিয়ত মানলেই হবে না, তরিকত না ধরলে আসল মুসলমান হওয়া যায় না। এই কথাটা বলার অধিকার কারো নেই, কারো নেই, কারোরই নেই। যে বলবে সে অজ্ঞ। কারণ এসবের ভিত্তি কুরআন বা সহিহ হাদিসের কোথাও নেই।
(এহইয়াউ উলুমুদ্দিন নিয়ে আলেমদের মধ্যে কিছু বিতর্ক আছে। ইমাম যাহাবি, ইবনুল জাওযি সহ বেশ কয়েকজন আলেম বইটির কিছু অংশে দুর্বল বা জাল হাদিসের ব্যবহার এবং কিছু তাসাওয়ুফি ধারণার অনুপ্রবেশের বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তাই বইটি পড়লে সতর্কতার সাথে এবং ইলমের আলোকে পড়া উচিত। আমি মনে করি এই বইটা কেবল আলেমদেরই পড়া উচিত যাদের মধ্যে সহিহ হাদিস, দুর্বল হাদিস ও জাল হাদিসের জ্ঞান আছে।)
এবার আসি আরেকটা প্রশ্নে, পীর ধরা কি ফরজ? এই প্রশ্নের উত্তরটা সরাসরি এবং স্পষ্টভাবে দেয়া দরকার। আর এর সরাসরি উত্তর হলো, না। এটা ফরজ না, সুন্নত না ইভেন মুস্তাহাবও না।
কুরআনের কোথাও এই নির্দেশ নেই যে কোনো নির্দিষ্ট সিলসিলার পীরের হাতে বায়াত নিতে হবে। সহিহ হাদিসের কোথাও এই নির্দেশ নেই। সাহাবায়ে কেরাম এইভাবে কারো মুরিদ হননি। তারা সরাসরি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে শিখেছিলেন, এবং তাঁর ইন্তেকালের পরে তাবেয়িনরা সাহাবাদের কাছ থেকে শিখেছিলেন। এই শেখা ছিল ইলমের শিক্ষা, কোনো আধ্যাত্মিক ক্ষমতা সঞ্চারণের অনুষ্ঠান না। ইসলামের সবচেয়ে সোনালি যুগে, যে যুগকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে সর্বোত্তম যুগ বলে গেছেন, সেই যুগে কোনো সিলসিলার অস্তিত্বই ছিল না। অথচ সেই যুগের মানুষরাই ছিলেন সবচেয়ে বেশি আল্লাহমুখী, সবচেয়ে বেশি আত্মশুদ্ধ।
তাহলে ভালো আলেমদের কাছ থেকে কি দ্বীন শেখা যাবে না?
অবশ্যই যাবে। বরং এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষ যদি কোনো বিশ্বস্ত আলেমের কাছ থেকে কুরআন বোঝেন, হাদিস শেখেন, অন্তরের পরিশুদ্ধির পথ শেখেন, সেটা ইসলামের একটি সুন্দর ধারাবাহিকতা। কিন্তু সেই শেখার সম্পর্কটা আর তরিকতের পীর মুরিদ সম্পর্কের মধ্যে একটা গভীর পার্থক্য আছে। আলেমের কাছে যাওয়া হয় জ্ঞান নেওয়ার জন্য, নিজেকে বিচার করার ক্ষমতা রেখে। আর পীরের কাছে যে সম্পর্ক তৈরি হয় সেখানে প্রায়ই বলা হয় মুরিদকে পীরের সামনে মৃতের মতো থাকতে হবে, নিজের বিচারবুদ্ধি ব্যবহার না করতে বলা হয়, পীর যা বলে তাতেই নাকি কল্যাণ। আর এই সম্পর্ক একজন মানুষকে তার নিজের চিন্তার ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করে এবং ধীরে ধীরে পীরের উপর এমন নির্ভরশীলতা তৈরি করে যেটা আল্লাহর উপর নির্ভরশীলতাকে দুর্বল করে দেয়। এখান থেকেই শির্কের যাত্রা শুরু হয়।
এখানে একটা সতর্কতার কথা না বললে আলোচনাটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। একদিকে কিছু লোক আছে যারা বলছে পীর ছাড়া দ্বীন হয় না। আবার অন্যদিকে কিছু লোক আছে যারা যেকোনো আধ্যাত্মিক চর্চাকেই বিদআত বলছে, যিকিরের মজলিসকে বিদআত বলছে। কিন্তু প্রকৃত পথ এই দুটো চরম সিদ্ধান্তের মাঝামাঝিতে। অন্তরের তাযকিয়াহ ইসলামের অপরিহার্য অংশ।
আল্লাহ কুরআনে বলেছেন নিশ্চয়ই সে সফল হলো যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করল। (সূরা আশ-শামস, ৯১:৯)
এই পরিশুদ্ধির কাজ না করলে শুধু বাইরের আমল দিয়ে আসল দ্বীনদারি হয় না, এটা সত্যি কথা। কিন্তু সেই পরিশুদ্ধির জন্য কোনো পীরের বায়াত লাগে না, কোনো সিলসিলার অনুমতি লাগে না। সরাসরি কুরআন, সহিহ হাদিস এবং সেই অনুযায়ী জীবন গঠনের মাধ্যমেই এটা সম্ভব।
একজন সাধারণ মানুষের দ্বীন কীভাবে পরিপূর্ণ হবে?
এই প্রশ্নের উত্তরটা আসলে অত জটিল না। কিন্তু এটাকে জটিল বানিয়ে রাখা হয়েছে।
প্রথমত, কুরআন বুঝে পড়ার অভ্যাস করেন। অর্থ না বুঝে পড়া আর বুঝে পড়া দুটো সম্পূর্ণ আলাদা অভিজ্ঞতা। যখন আপনি বুঝবেন আল্লাহ কী বলছেন, তখন প্রতিটি আয়াত আপনার ভেতরে কাজ করতে শুরু করবে। এটা কোনো পীরের সুহবতের বিকল্প না, এটা তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী কিছু।
দ্বিতীয়ত, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে আপনি যা পড়ছেন তার অর্থ জানুন। নামাজে আপনি সূরা ফাতেহায় বলছেন ইহদিনাস সিরাতল মুস্তাক্বিম, এর অর্থ হলো আমাদের সরল পথ দেখান/চালিত করুন। এভাবে প্রতিটি আয়াতের অর্থ যদি বোঝেন এবং অনুভব করেন, তাহলে প্রতিটি নামাজ আপনার কাছে আল্লাহর সাথে একটি সরাসরি কথোপকথনের মতো মনে হবে।
তৃতীয়ত, অন্তরের রোগগুলো চেনার চেষ্টা করেন। অহংকার, হিংসা, রিয়া বা লোক দেখানো ইবাদত, লোভ, এগুলো কুরআন ও হাদিসের আলোকে কীভাবে চেনা যায় এবং সারানো যায় সেটা জানেন। এজন্য বড় বড় কিতাব পড়তে হবে না (তবে ভালো কিতাব পড়া অবশ্যই উত্তম)। প্রতিদিন একটু একটু করে নিজের অন্তরকে পর্যবেক্ষণ করেন, আপনার ছোট ছোট কর্মকাণ্ড গুলো মনিটর করেন। আপনার কোন কথায় সুক্ষ্ম রাগের ছায়া রয়েছে যেটা না থাকলেও চলতো, কখন আপনার মনে হালকা ঈর্ষার অনূভুতি হয়েছে, আপনি কোন ইবাদতটা করতে গিয়ে আশেপাশের মানুষের বাহবা আশা করেছেন, কোন বিষয়ে সুক্ষ্ম লোভ অনুভব করেছেন এধরণের প্রতিটি বিষয়ে মনোনিবেশ করবেন এবং সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে এগুলো থেকে বিরত থাকার প্রতিজ্ঞা করবেন। বারবার এই ভুলগুলো হবে আপনিও বারবার ইস্তেগফার পড়ে ক্ষমা চাইবেন। ইনশাআল্লাহ ধীরে ধীরে এই বিষয়গুলো শুধরে যাবে।
চতুর্থত, সৎ সঙ্গ রাখেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের উপর থাকে। (সুনান আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৮৩৩)
এমন মানুষদের সাথে থাকেন যাদের দেখলে আল্লাহর কথা মনে পড়ে। এটাই আসল সুহবত।
পঞ্চমত, আল্লাহর কাছে সরাসরি দুআ করেন। কোনো মাধ্যম ছাড়াই। আল্লাহ তায়ালা সূরা বাকারায় বলেছেন, আমি কাছেই আছি, যখন আমার বান্দা আমাকে ডাকে আমি সাড়া দিই। (সূরা আল বাকারা, ২:১৮৬)
আপনার রবের পক্ষ থেকে এর চেয়ে স্পষ্ট আশ্বাস আর কী হতে পারে?
আপনাদের অনেকেই এমন আছেন যাদের পরিবার অলরেডি কোনো পীরের ভক্ত হয়ে আছে, কিন্তু আপনি তাদেরকে বোঝাতে পারছেন না। এখন আপনার করণীয় কি?
এই প্রশ্নটা অনেকের জন্য বাস্তব কষ্টের জায়গা। আপনার পরিবারের মানুষ পীরের মুরিদ, আর আপনি বুঝতে পেরেছেন এর মধ্যে সমস্যা আছে, কিন্তু পরিবারের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করাও উচিত না। আর সেই কাজটাই করবেন না। তর্ক করবেন না, জোর করে, ঝগড়া করে বোঝাতে যাবেন না। কারণ মানুষ মেজাজ গরম অবস্থায় কোনো তর্কে হেরে গেলে তাদের বিশ্বাসে পরিবর্তন আসে না, উল্টা ইগো চেপে বসে। আপনি আপনার জায়গা থেকে শান্ত ভাবে, সুন্দর আচরণের সাথে বাস্তবতাগুলো তুলে ধরবেন। আপনার নামাজে পরিবর্তন নিয়ে আসেন, আরও গভীরভাবে নামাজে আল্লাহর উপস্থিতিকে অনুভব করেন। আপনার আচরণে আরো নম্রতা নিয়ে আসেন, আপনার মিথ্যা নামক বস্তুটাকে জীবন থেকে ঝেড়ে ফেলে দেন। আপনি নিজের জীবনটাকে এমনভাবে পরিবর্তন করে ফেলেন যে পরিবর্তন দেখে তারাই আপনার কাছে আসবে সত্যটা জানার জন্য, ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, যারা আমার পথে চেষ্টা করে আমি তাদের অবশ্যই আমার পথ দেখিয়ে দিই। (সূরা আল আনকাবুত, ২৯:৬৯)
এই প্রতিশ্রুতি আল্লাহর নিজের। মনে রাখবেন পৃথিবীর সকল প্রতিশ্রুতির চেয়ে এই প্রতিশ্রুতি অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য।
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে ঠিক সেইভাবে তার দ্বীনের জন্য কবুল করে নিন, যেভাবে তিনি আমাদরেকে দেখতে চান! আমিন ইয়া রাব্বুল আলামিন!
(লেখা শেষে বর্তমান সময়ের একটা বড় ফিতনাবাজ মানুষের নাম বলে দিচ্ছি তার থেকে সতর্ক থাকবেন। Hafez Saifullah Mansur, ইসলামি লেবাসে এই লোক একজন ভন্ড, তান্ত্রিক এবং জ্যোতিষ। যারা তাকে চেনেন অবশ্যই তার থেকে সতর্ক হয়ে যান আর যারা চেনেন না তার নামটা চিনে রাখেন, তবে তার ব্যাপারে জানার প্রয়োজন নেই। তার ফিতনা সম্পর্কে জানতে আমার প্রোফাইলের রিসেন্ট পোস্টগুলো চেক দিতে পারেন। আমি তার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েই কথাগুলো বললাম।)
~ repost
stay connected,
— The End-Times Archive

0 মন্তব্যসমূহ